:

পশ্চিমবঙ্গে ‘গেরুয়া’ সূর্যোদয় ও মমতার পতন:সীমান্তে বাড়ছে উদ্বেগের মেঘ

top-news

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভাবনীয় পরিবর্তনের সাক্ষী হলো ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন। দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতের এই সীমান্তবর্তী রাজ্যে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় বসতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।

২৯ এপ্রিলের শেষ দফার ভোটগ্রহণ শেষে ৪ মে ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০-র বেশি আসন নিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে গেরুয়া শিবির। বিপরীতে, ‘দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ ও উত্তরবঙ্গে নজিরবিহীন ধসের মুখে পড়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

 কেন হারলেন মমতা? তৃণমূলের দুর্গে ধসের ৮ কারণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মমতার পরাজয়ের পেছনে কাজ করেছে একাধিক পুঞ্জীভূত কারণ:

ভয়াবহ দুর্নীতি ও টাকার পাহাড়: গত পাঁচ বছরে শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি, রেশন দুর্নীতি এবং কয়লা-গরু পাচার মামলায় তৃণমূলের শীর্ষ নেতাদের কারাবরণ সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। বিশেষ করে প্রাক্তন মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বান্ধবীর বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া কোটি কোটি টাকার ছবি তৃণমূলের ‘সততার প্রতীক’ ইমেজকে ধূলিসাৎ করে দেয়।

এসআইআর (SIR) বা ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন: এবারের নির্বাচনের তুরুপের তাস ছিল ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন। এর ফলে কয়েক লাখ ‘ভুয়া’ বা ‘স্থানান্তরিত’ ভোটার বাদ পড়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় তৃণমূলের বড় ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে পরিচিত একটি বিশাল অংশের ভোটার ভোটাধিকার হারান, যা নির্বাচনী পাটিগণিত বদলে দিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া ও মাস্তানি: তৃণমূলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের ‘সিন্ডিকেট’ রাজ এবং ‘তোলাবাজি’র বিরুদ্ধে আমজনতার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবার ব্যালটে প্রতিফলিত হয়েছে। ২০২১ সালের পর মমতা নিজেকে সংশোধনের সুযোগ পেলেও তা কাজে লাগাতে পারেননি বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো: নির্বাচন কমিশনের কঠোর হস্তক্ষেপে পুলিশের ওপর তৃণমূলের নিরঙ্কুশ প্রভাব নষ্ট হয়। জেলা শাসক থেকে শুরু করে বিডিও (BDO) স্তরে ব্যাপক রদবদল পুলিশকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে বাধ্য করে।

আই-প্যাক (I-PAC) সংকট: ভোটের মুখে তৃণমূলের নির্বাচনী পরামর্শদাতা সংস্থা আই-প্যাকের ডিরেক্টর ইডির হাতে গ্রেফতার হওয়া এবং সংস্থার কাজ বন্ধ করার ঘোষণা দলের সাংগঠনিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল।

ফলাফল পরবর্তী সহিংসতা

জয়ের খবর আসার পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে তৃণমূল কার্যালয় ও নেতাদের ওপর হামলার খবর পাওয়া গেছে। 

কালীঘাটে হামলা:  তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দপ্তরে হামলা চালিয়েছে বিজেপি সমর্থকরা। 
নেতাদের ওপর হামলা: বীজপুরের তৃণমূল প্রার্থী সুবোধ অধিকারীকে প্রকাশ্য দিবালোকে মারধর ও পোশাক ছিঁড়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। ব্যারাকপুরে অভিনেতা ও তৃণমূল প্রার্থী রাজ চক্রবর্তী এবং সোমনাথ শ্যামকে লক্ষ্য করে কাদা ও চটি ছোড়া হয়। 
বিজেপির প্রতিক্রিয়া: জয়ী বিজেপি প্রার্থী সুদীপ্ত দাসের মতে, এটি তৃণমূলের দীর্ঘদিনের ‘অত্যাচারের পরিণাম’। তবে বিজেপি নেতা অর্জুন সিং কর্মীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

পশ্চিমবঙ্গের সম্ভাব্য বিভক্তি: নতুন ভৌগোলিক শঙ্কা
বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহার ও প্রচারণায় বারবার উঠে এসেছে উত্তরবঙ্গকে পৃথক রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করার প্রসঙ্গ। পাহাড় ও কোচবিহার অঞ্চলে বিজেপির একচেটিয়া জয় সেই দাবিকে আরও জোরালো করেছে। রাজনৈতিক মহলের আশঙ্কা, ক্ষমতায় এসে বিজেপি যদি পশ্চিমবঙ্গ ভেঙে ‘দার্জিলিং’ বা ‘কোচবিহার’ কেন্দ্রিক নতুন রাজ্য গঠন করে, তবে চা ও পর্যটন শিল্প হারিয়ে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি ও জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্ব চরমভাবে হ্রাস পাবে।

বাংলাদেশের উদ্বেগ: ‘পুশ-ইন’ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চাপ

পশ্চিমবঙ্গের এই পালাবদল বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে:

এসআইআর ও অনুপ্রবেশ ইস্যু:  এসআইআর প্রক্রিয়ায় বাদ পড়া লাখ লাখ মানুষকে যদি ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে পুশ-ইন করার চেষ্টা করা হয়, তবে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে চরম উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।

সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ: পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় এবং আসামে হিমন্ত বিশ্বশর্মার ‘অবৈধ মুসলিম তাড়ানো’র রাজনীতি দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানকে ত্বরান্বিত করবে। এর ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ধর্মীয় পরিচয়বাদী শক্তিগুলো পুষ্ট হতে পারে।

তিস্তা ও দ্বিপাক্ষিক ইস্যু: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিস্তা চুক্তিতে বাধা দিলেও, বিজেপি সরকার কেন্দ্রীয় নীতি মেনে কী ভূমিকা নেয় তা দেখার বিষয়। তবে তাদের আগ্রাসী ‘বাংলাদেশি বিরোধী’ প্রচারণা সীমান্তে উত্তেজনা বাড়িয়ে রাখতে পারে।

ভারতের অন্যান্য রাজ্যের চিত্র
শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, অসমেও বিজেপি সেঞ্চুরি পার করে টানা ক্ষমতায় ফিরছে। তবে দক্ষিণ ভারতে তামিলনাড়ুতে বড় চমক দেখিয়েছেন অভিনেতা বিজয়ের দল ‘টিভিকে’ (TVK)। সেখানে ঐতিহ্যবাহী দ্রাবিড় দল ডিএমকে (DMK) ও এআইএডিএমকে-কে হটিয়ে বিজয় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে।

স্ট্যালিনের মতো শক্তিশালী নেতার পরাজয় প্রমাণ করছে ভারতের রাজনীতিতে আঞ্চলিক দলগুলোর জন্য এক অসম যুদ্ধের সময় শুরু হয়েছে।

 ২০২৬ সালের এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গের আত্মপরিচয় এবং বাংলাদেশের সাথে এর দীর্ঘদিনের সম্পর্কের রসায়ন বদলে দেওয়ার এক সন্ধিক্ষণ।

নবান্নে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান আর গেরুয়া আবিরের উল্লাস আগামীর এক নতুন ও ভিন্নতর পশ্চিমবঙ্গের ইঙ্গিত দিচ্ছে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *